বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আগাগোড়া

মোঃ আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের

পররাষ্ট্রনীতি কি

প্রথমেই আমাদের জানতে হবে পররাষ্ট্রনীতি কি এবং এর লক্ষ্য কি সেটা।
নিজ দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি দেশ অপর দেশগুলোর ক্ষেত্রে যে ধরনের নীতিমালা গ্রহণ ও প্রয়োগ করে থাকে স্বাভাবিকভাবে তাকেই আমরা পররাষ্ট্রনীতি বা বৈদেশিক নীতি ধরবো।
নিজের সর্বোচ্চ স্বার্থ সংরক্ষণ করে কূটনৈতিকভাবে অন্যান্য দেশের থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নেয়াই হলো পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রনীতির এই সংজ্ঞা এবং এর লক্ষ্যটা ভালোভাবে পড়ে নিন কেননা এর উপরই আমরা আজ আলোচনা করতে যাচ্ছি এবং এর ভেতরই আমরা অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো।

কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে পার্থক্য

কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ক
কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ক

সবারই একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দরকার যেটি বারবার বিভিন্ন জায়গায় আমরা জানতে চেয়ে থাকি বা বুঝতে চাই৷ সেটা হলো- কূটনীতি কি জিনিস, এবং পররাষ্ট্রনীতি এবং কূটনীতির মধ্যে আদৌ কোনো পার্থক্য আছে কিনা এবং থাকলেও সেটি কি।
সহজ ভাষায় বুঝতে গেলে কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে আদতে খুব একটা পার্থক্য নেই। পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে একটা দেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক সামগ্রিক নীতিসমূহ, আর কূটনীতি হলো সেই নীতিগুলোকে কার্যকর করার উপায়, কৌশল বা পদ্ধতি। আরো সহজে বলা যায়, পররাষ্ট্রনীতি হলো লক্ষ্য এবং কূটনীতিটা হলো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর মাধ্যম।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য

আজকে যেহেতু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা আমরা করতে চাই তাহলে আমাদের প্রথমে জানতে হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি এবং এর প্রকৃতি কেমন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে গেছিলেন, ‘সকলের সাথেই বন্ধুত্ব; কারো সাথে শত্রুতা নয়।’ অর্থাৎ সব দেশের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে নিরপেক্ষভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বা প্রকৃতি।
পরে বলতে গেলে এর বাইরেও বিস্তারিত অনেক সংযোজন বিয়োজন হয়েছে।

বাংলাদেশের মৌলিক পররাষ্ট্রনীতি

বাংলাদেশের মৌলিক পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের সংবিধানের নিম্নোক্ত বিধানসমূহ থেকে উদ্ভূতঃ

রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি সম্মান বজায় রেখে, অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধার উপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন করবে-

* আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ না করা এবং সাধারন ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য সংগ্রাম করা;
* প্রতিটি মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং তার নিজের পছন্দ অনুযায়ী নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে সমর্থন করা;
এবং
*সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা বা জাতিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সারা বিশ্বের সকল নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

যুদ্ধ ঘোষণা ও বৈদেশিক চুক্তি সংক্রান্ত নীতি

বাংলাদেশের সংবিধান
বাংলাদেশের সংবিধান

আমাদের সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না।
অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

এছাড়াও বাংলাদেশ জাতিসংঘ সহ যে সমস্ত আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য তাদের মূলনীতিও মেনে নিজের পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছে।
ভৌগলিক অবস্থানগত কারনে হোক আর দূর্বল অর্থনীতি ও বিরাট জনসংখ্যার চাপে হোক, বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপরও নির্ভরশীল।

তাহলে আমরা কয়েকটা জিনিস দেখতে পাই-

প্রথমত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাইরে নিজ স্বার্থ অর্জনের উপর ভিত্তি করে স্থাপিত;
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনেকগুলো বিষয়ের দ্বারা প্রভাবিত;
তৃতীয়ত, এই বাইরের প্রভাব অনেকসময় একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি সৃষ্টির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে;

পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় স্বার্থের সম্পর্ক

এটা সত্য যে কোনো না কোনো কারনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি খুব একটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারছে না।
আর যখন সেই কারনটা খুঁজতে যাওয়া হয় সকলে বলাবলি করেন, বাংলাদেশের আয়তন ছোট, অনেক দেশের সাহায্য ছাড়া চলা সম্ভব হয় না এ সমস্ত কারনে পররাষ্ট্রনীতি শক্তিশালী ও করা যায় না এবং প্রভাবিত হতে হয়৷

কিন্তু মূল যে কারনটা সবাই ভুল করে কাটিয়ে যায় সেটি হলো জাতীয় স্বার্থ। একটু চিন্তা করলেই খুব সহজেই আমরা বুঝতে পারি এখনো পর্যন্ত দেশের জাতীয় নির্ধারকরা দেশের মূল স্বার্থগুলো কি কি তাই সঠিকভাবে ঠিক করতে সমর্থ হন নি! স্বাধীনতার পর অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছেন এবং দেশের মূলনীতি ও আদর্শ বারংবার পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন, যে চারটি আদর্শের ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো ৭৫’ এর পর সেই আদর্শগুলোকেই পরিবর্তিত করা হয়। আবার সেটিকে একটি রূপ দেয়া হয় পরে আবারো তা পরিবর্তন করা হয়৷ অর্থাৎ জাতীয় মূলনীতি ও চেতনা কি তার ব্যাপারেই এখনো দোদুল্যমানতা রয়েছে। এটা কেন সৃষ্টি হয়েছে তা জানার জন্য হয়তো বা আমরা অন্য কোনো একটি লেখায় উত্তর খুঁজবো কিন্তু এটাই সত্যি এ সমস্যা বিরাজমান। আর জাতীয় মূলনীতির উপর নির্ভর করেই তো সৃষ্টি হয় জাতীয় স্বার্থ। কয়েকবছর পরপর মূলনীতি পরিবর্তনের ফলে জাতীয় স্বার্থ ও পরিবর্তিত হয়েছে। এই অবস্থার কারনে কখনোই বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে খুব শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারেনি বা কারো প্রভাবমুক্ত থেকে জাতীয় স্বার্থ অর্জনেও খুব সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।

অনেকেই বলতে পারেন দেশটা ছোট বিধায় সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারেনা, সেজন্য অনেকসময় প্রভাবিত হতে হয়। অবশ্যই এটা একটা কারন কিন্তু মূল কারন নয়। জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ এক হলে এ ধরনের সমস্যা খুবই গৌন হতো। কিউবার মতো ছোট দেশগুলো আমরা দেখতে পাই কিভাবে পরাশক্তি আমেরিকার সাথে লড়াই করেও এতবছর টিকে আছে। বাংলাদেশের স্বাধীন হবার পেছনেও সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিলো এই জাতীয় ঐক্যের। সমস্ত বাঙালীরা একমত ছিলেন তাদের অধিকারের জন্য তাদের স্বাধীন হতে হবে। আর এই একতাই শক্তি ও জাতীয় স্বার্থ হয়ে একটি দেশ উপহার দেয়। তাই শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির পূর্বে জাতীয় স্বার্থে একমত হওয়া অধিক জরুরী।

পররাষ্ট্রনীতির দূর্বলতা

এবার একটু আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দূর্বলতা নিয়ে কথা বলা যাক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দূর্বল হবার পেছনে আমি আটটি নিয়ামক প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছি। এগুলো হলোঃ

১. ভৌগলিক অবস্থান
২. আয়তন
৩. কট্টর মতবাদ ও মতের অমিল
৪. তীব্র ধর্মীয় অনুভূতি
৫. রাজনৈতিক অস্থিরতা
৬. পরনির্ভরশীলতা
৭. দূর্বল শিক্ষাকাঠামো
৮. জাতীয় স্বার্থে অনিশ্চয়তা।

এগুলো কিভাবে একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি সৃষ্টি করতে দিচ্ছে না আসুন একটু আলোচনা করা যাক।

১. ভৌগলিক অবস্থান

বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান
বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর তিন দিকেই ভারত এবং একপাশে মিয়ানমারের কিছু বর্ডার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর বিদ্যমান। বিশাল একটি দেশ বাংলাদেশের তিনদিক থেকে ঘিরে ধরবার কারনে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশকে তার পার্শ্ববর্তী দেশের দ্বারা অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবিত হতে হয় এবং আপদকালীন বিকল্প মিত্র সৃষ্টির খুব একটা সম্ভাবনা দেখা যায় না। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে বাইরের আগ্রাসন সহ্য করতে হয়। যেমন সীমান্তে বিএসএফ এর আগ্রাসন এবং তিস্তা চুক্তির খেলাপ ও বাঁধ সৃষ্টি করে বাংলাদেশে পানির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা।

২. আয়তন ও জনসংখ্যা

জনসংখ্যার ঘনবসতি
জনসংখ্যার ঘনবসতি

আয়তনে বাংলাদেশ খুব ছোট আকারের এবং জনসংখ্যায় পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ ঘরে ও বাইরে অনেক ক্ষেত্রে বেগ পেয়ে চলছে। অনেকেই বলতে পারেন অনেক ছোট আয়তনের দেশও তো শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে চলেছে। আসলে এমন আয়তনের সাথে এমন ঘনবসতি কোনো দেশের নেই। বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা থাকবার কারনে এদের ভরণপোষণ ও দেখভালেই সরকারের সবসময় তটস্থ হয়ে থাকতে হয়।

৩. কট্টর মতবাদ ও মতের অমিল

পরমতসহিষ্ণুতার অভাব এবং নিজ মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করবার অসুস্থ প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের নীতি প্রণয়নে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

৪. তীব্র ধর্মীয় অনুভূতি

ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের ভেতরে ধর্মীয় অনুভূতি অত্যন্ত তীব্র এবং অতীতে আমরা দেখেছি বর্তমানেও দেখছি সূক্ষ্ণ বিষয়েও এ উপমহাদেশের মানুষ দাঙ্গার সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

৫. রাজনৈতিক অস্থিরতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশের জন্ম হবার সময় থেকে এখনো পর্যন্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা এতটাই বেশি বিরাজমান ছিলো যে বাইরের অনেক রাষ্ট্র বা শক্তি বরাবর এবং বারবার এ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে নাক গলিয়েছে এবং বিভিন্ন দলকেও প্রভাবিত করেছে৷ উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মেজর জলিল যখন জাসদের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন তখন তিনি লিবিয়া থেকে অর্থ সহযোগিতা পেতেন। বিনিময়ে লিবিয়া তার দলীয় কিছু বিষয়ে নাক গলাবার সুযোগ পেতো। (তথ্যসূত্রঃ জাসদের উত্থান ও পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি)
এছাড়াও ৩ ও ৪ নম্বর নিয়ামক তথা কট্টর মতবাদ এবং তীব্র ধর্মীয় অনুভূতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরো প্রভাবিত করেছে।
এমন অস্থিরতার কারনে কোনো সরকারই শক্তিশালী ভাবে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে সক্ষম হয়নি।

৬. পরনির্ভরশীলতা

বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত বেকারত্ব সমস্যার শতভাগ দূরীকরণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, দুর্নীতি ছাড়া আরো অনেক সমস্যার কারনে বিদেশের প্রতি পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আর পরনির্ভরশীল থাকলে সে দেশের প্রতি পররাষ্ট্রনীতিও শক্তিশালী হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। অতীতে বাংলাদেশ সার্ক গঠন করলেও এবং এর নেতৃত্ব দিয়ে নিজেকে জানান দেবার চেষ্টা করলেও ভারত পরে কৌশলগত ভাবে একে অকার্যকর করে দেয়। বর্তমানেও যদি দেখি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এত ভালো সম্পর্ক বাংলাদেশের থাকবার পরও তারা বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত বানিজ্যিক সুবিধা প্রদান করছে না।

৭. দূর্বল শিক্ষাকাঠামো:

বাংলাদেশের শিক্ষাকাঠামো তুলনামূলক ভাবে অনেক দূর্বল। চাকরির উদ্দেশ্য শিক্ষা চর্চা বেশি হয় এখানে জ্ঞানের উদ্দেশ্যে নয়। তাছাড়া শিক্ষানীতি সকলের জন্য সহজলভ্য এখনো শতভাগ না হবার কারনে এবং নৈতিক শিক্ষার বিস্তার ও চর্চা না থাকবার কারনে ভালো মানের মানুষ, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ তৈরী হয়না। যার ফলে শক্তিশালী পলিসি তৈরীও অসম্ভব থেকে যায়।

৮. জাতীয় স্বার্থে অনিশ্চয়তা

এটি বাংলাদেশের শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি সৃষ্টি না হবার পেছনে সবথেকে বড় কারন। উপরের সবগুলো নিয়ামক এর সাথে সংযুক্ত এবং কোনো না কোনো ভাবে কখনোই বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থে কখনো এক হতে পারেনি। দেশের সকল মানুষের মতামতের ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং তা গ্রহণের চেষ্টা ও কম হয়েছে৷ যে সরকারই এসেছে তারা তাদের মূলনীতি ও মতাদর্শ অনুযায়ী সংবিধানকে পরিবর্তন করবার চেষ্টা করেছে। দেশের মূল জাতীয় স্বার্থ একক না হবার কারন হলো জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি না হওয়া যেমনটি আমরা আগের পর্বে দেখেছিলাম আর জাতীয় স্বার্থ কি তাই ঠিক না করতে পারবার কারনে শক্তিশালী জাতীয় মূলনীতিই তৈরি হয়নি। আর এমন মূলনীতির অভাবে শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতিও সৃষ্টি হয়নি।

বাংলাদেশের পরাষ্ট্রনীতি নিয়ে বই

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রহমানের দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি বেশ বিখ্যাত বই ও রয়েছে ‘বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি’ নামে। সেখানে সুবিস্তারিত আপনারা আরো তথ্য পাবেন এ ব্যাপারে। এখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়েও বেশ পরিষ্কার আলোচনা রয়েছে।
আটটি অধ্যায়ে লেখা এই বইটির প্রথম অধ্যায়ে সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির যে ধারা সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ দশকের পররাষ্ট্রনীতির একটি বিশ্লেষণ সেখানে রয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বই - তারেক শামসুর রহমান
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বই – তারেক শামসুর রহমান

দ্বিতীয় অধ্যায়ে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার আলোকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোচনা করা হয়েছে।
দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের ভূমিকা ও জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশের সাথে অন্যান্য দেশগুলোর সম্পর্কের তুলনামূলক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র চীন মিয়ানমার ও জাপানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও আলোচনা করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের নানাবিধ দিক আলোকপাত করা হয়েছে যেহেতু ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ছিলো। এছাড়া এর পরের অধ্যায়গুলোতে যথাক্রমে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ও প্রাচীন কটন রুট, জলবায়ু সংক্রান্ত সম্মেলন ও বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক কূটনীতি নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। আর পরিশেষে অষ্টম অধ্যায় রয়েছে উপসংহার।

উপসংহার

আসলে বলা যায়, অনেক কারনেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করতে পারছে না এবং বিদেশ থেকে নিজ সুবিধা আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের পলিসি মেকারদের এক টেবিলে বসে এর সমাধান তো খুঁজতে হবেই, পাশাপাশি এ ব্যাপারে আরো অনেক গবেষণা এবং গবেষণা বরাদ্দ ও দরকার বটে।
শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক ভাবে শক্ত দেশগুলো সবসময়ই এরকম খাতে মনযোগী হয়ে থাকে। আসিয়ান টাইগার খ্যাত বাংলাদেশের উত্থানের পথে এখনই সঠিক সুযোগ।
শক্ত পলিসি এবং দক্ষ কূটনীতিই পারে একটা দেশকে বিশ্বদরবারে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর গৌরব এনে দিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *