আল মাহমুদের গল্প: বুক রিভিউ

রেদ্ওয়ান আহমদ

পরিচয় : আল মাহমুদের গল্প

গল্পগ্রন্থ : আল মাহমুদের গল্প
গল্পকার : আল মাহমুদ
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশনা : একুশে বাংলা প্রকাশন
প্রকাশকাল : একুশে বইমেলা ২০১৮
ISBN : 978-984-93349-65
প্রচ্ছদমূল্য : ৪৫০ টাকা

আমাদের আল মাহমুদ

আল-মাহমুদ, যাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের আধুনিক রেনেসাঁর কবি। কিন্তু শুধু কবি পরিচয়ে তার ব্যপক পরিচয়কে সংকীর্ণ করে দেয়া হয়। আল-মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের সর্বাধুনিক বাস্তববাদী কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও কলামিস্ট। বলা হয়ে থাকে, বাংলা সাহিত্যে কবি জীবনানন্দ দাশের পর যদি কেউ বেঁচে থাকেন তিনি হবেন কবি আল-মাহমুদ।

আল মাহমুদ
আল মাহমুদ

আল মাহমুদের গল্প রিভিউ

তার স্বতঃস্ফূর্ত লেখনীতে গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোর সামাজিক পরিবেশ এবং সংগ্রামমুখর জনজীবনের প্রেম-ভালোবাসা, বিরাগ-বেদনা, ব্যর্থতা-হতাশার বাস্তব প্রতিকৃতি ফুটে উঠে। তার লেখার মূল উপজীব্যই যেনো বাস্তব জীবনবোধের সাথে প্রেম-প্রকৃতির মিল-বন্ধন।

তেমনি একটি বই ‘আল-মাহমুদের গল্প’ গ্রন্থটি। যেটিতে গল্পকার আল-মাহমুদের “রোকনের স্বপ্নদোলা, বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা, ভেজা কাফন, নীল নাকফুল, উত্তর পাহাড়ের ঝরনা, পশর নদীর গাঙচিল, স্বজাতি, পাতার শিহরণ, নিশি বিড়ালির আর্তস্বর, জলবেশ্যা, পুত্র ও মৃগয়া” নামের মোট ১২টি বড়গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। যার মধ্যে তার সবগুলো গল্পই ক্লাসিকাল ও উচ্চমার্গীয়। খন্ড-খন্ড ঘটনাকে আল-মাহমুদ অলংকৃত শব্দমালা, উপমা ও উপস্থাপনা দ্বারা যেভাবে বাস্তবযোগ্য করে তুলেছেন, তা সত্যিই অনন্য-অসাধারণ।

গল্প পর্যালোচনা

‘আল-মাহমুদের গল্প’ বইটির প্রতিটি গল্প যেমন শিল্পমণ্ডিত তেমনই জীবনমুখী। এই ১২টি গল্পের মধ্যে ‘নীল নাকফুল, উত্তর পাহাড়ের ঝরনা, স্বজাতি, জলবেশ্যা ও পুত্র’ এই ৫টি গল্পের কোনো তুলনাই যেনো হয় না।
আল-মাহমুদ তার লেখায় যেভাবে উপমার ব্যবহার করেছেন, যার কারণে আল-মাহমুদকে ‘উপমার কবি’ বলা হয়ে থাকে ।

‘রোকনের স্বপ্নদোলা’ গল্পটিতে গল্পকার আল-মাহমুদ ট্রেন ভ্রমণে এক শৈল্পিক স্বপ্নবৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন। যেখানে তিনি ম্যাজিশিয়ানদের অকল্পনীয় কর্মকাণ্ডের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন কয়েকটি চরিত্রের ভাস্কর্য দ্বারা।

‘বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা’য় তিনি দেখিয়েছেন আমাদের শহুরে জীবন-যাপনে পারিবারিক দৃশ্যায়ন। যেখানে স্বামী-স্ত্রী-কাজের মেয়েই হলো প্রধান চরিত্র।
‘ভেজা কাফন’ গল্পে গল্পকার চিত্রায়ণ করেছেন কিভাবে অল্প বয়সেই সাজ্জাদের স্ত্রী সংসারের মোহ ছেড়ে পরপারে চলে যায়। বর্ণনা করেছেন সংসারের মায়া।

‘নীল নাকফুল’ গল্পটি আল-মাহমুদের ওয়ার্ল্ড-ক্লাসিক একটি গল্প। যে গল্পটি বিংশ শতাব্দীর ওসমান মিয়ার গল্প। ওসমানের বিবাহিতা স্ত্রীর গল্প। তার ভূসম্পত্তি না থাকার দরুন মালিককে বিয়ের কথা না বলতে পারার করুণ পরিনতির গল্প। নব-বিবাহিতা স্ত্রীর নীল নাকফুল আবদার পূরণ করতে গিয়ে দীর্ঘ এক বছর পর দেখা মেলে তার স্ত্রীকে বিয়ে করে ফেলেছে তার হাশেম চাচা। নীল নাকফুল হাতে নিজের স্ত্রীকে চাচি বলে কদমবুসি করার মর্মান্তিক ট্রাডেজিই তুলে ধরেছেন গল্পকার আল-মাহমুদ।

‘উত্তর পাহাড়ের ঝরনা’ গল্পে গল্পকার আদিবাসী গোষ্ঠীর জীবন-যাপন, সংগ্রাম, শিক্ষা-ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছেন ‘মং সু’ ও ‘মাইম্যা’ চরিত্রে।
‘পশুর নদীর গাঙচিল’ গল্পে আল-মাহমুদ সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তীদের জীবনধারণের কঠিন পরিস্থিতির কথা অনর্গল বলে গেছেন।

 কবি আলমাহমুদ এর গল্পগুলো
কবি আলমাহমুদ এর গল্পগুলো

‘স্বজাতি’ গল্পে গল্পকার আল-মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে ধরেছেন বিদেশের মাটিতে দেশের সন্তানের মুখে বিদেশি পরিচয়ে।
‘পাতার শিহরণ’ গল্পে সাংসারিক প্রেম-ভালোবাসা যেভাবে লেখক অনুপম গেয়েছেন তা অপার সৌন্দর্যে মণ্ডিত এক চরিত্রায়ন।

‘নিশি বিড়লের আর্তস্বর’ গল্পে বিড়াল চরিত্রে লেখক মানুষ ও পশুকে একি দাঁড়িপাল্লায় মেপেছেন। পশুপ্রেম যেখানে উপজীব্য হয়ে উঠেছিলো।
‘জলবেশ্যা’ গল্পে গল্পকার নৌ-যানে বেদেদের জীবন-যাপন তুলে ধরেছেন। লিখেছেন রাতের অন্ধকারে তাদের কারো কারো বেশ্যা হয়ে উঠার গল্প।

‘পুত্র’ গল্পটি ছিলো এক অনন্য গল্প। যেখানে লেখক টিনএজ সন্তানের কাছে স্মাতৃস্নেহের চেয়ে পুত্রের প্রেম ও পৌরুষ অগ্রগামী সেই বাস্তব কথাই ব্যক্ত করেছেন।
‘মৃগয়া’ গল্পে গল্পকার থ্রিলার ও এ্যডভেঞ্চারার কিছু চরিত্রের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। লেখক এ গল্পটিতে সঞ্চিদার মৃত্যুতে নীলুফারকে এক করুণ ট্রাজেডির সামনে এনে দাঁড় করিয়ে প্রমাণ দিতে চেয়েছেন তিনি আধুনিক গল্পকারদের থেকে কোনা অংশে কম নয়।

পরিশেষে বলব, গল্পকার আল-মাহমুদ যেভাবে তার গল্পগুলোর চরিত্রায়ণ করেছেন, উপমা ব্যবহার করেছেন এবং বাস্তবযোগ্য করে তুলেছেন তাতে গল্পকার নিতান্তই চরম মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল-মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *